মিজানুর রহমান দয়াল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। রাজপথে লড়াকু এক নেতা, যিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘অবৈধ অপশন’ বিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ‘হাসিনা পতন’ বিপ্লবের সম্মুখসারিতে ছিলেন। ৩৬ জুলাইয়ের বিজয়ের পর এবার সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরলেন অপহরণ, গুম, নির্যাতন ও কারাবাসের অভিজ্ঞতা।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় দয়াল বলেন, “এই আন্দোলন ছিল কেবল ছাত্রদের নয়- সারাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম।” দীর্ঘ দেড় যুগের রাজনৈতিক জীবনের গ্লানি ও গর্ব একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছিল তার কণ্ঠে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের এক গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিজ বাসা থেকে সাদা পোশাকে সশস্ত্র একদল ব্যক্তি তাকে তুলে নেয়। চোখ বেঁধে একাধিক স্থান ঘোরানোর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কেউই জানতে পারেননি তার অবস্থান। ডিবি কর্তৃপক্ষও তার আটকের কথা অস্বীকার করেছিল।
“ভেতরে আমাকে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। ছাত্রদলের আমান উল্লাহ আমান, তারেক রহমান ও প্রবাসী নেতাদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হতো। বললেও মারে, না বললেও মারে,” বলেন দয়াল।
ডিবি হেফাজতেই পরিচয় হয় ব্যারিস্টার অসীমের সঙ্গে। তার সাহচর্যে কিছুটা মানসিক শক্তি ফিরে পান। এরপর সেখানে আনা হয় মাত্র ১৭ বছরের তরুণ হাসনাতুল ইসলাম ফাইয়াজকে, যিনি সদ্য ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তার গায়ে ছিল জাতীয় দলের জার্সি।
“ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন আমারই ছোট ভাই। আমি ওকে আগলে রাখতে চেয়েছি। কিন্তু রাষ্ট্র এমনকি একজন কিশোরের প্রতিও দয়া দেখায়নি,” বলেন দয়াল।
রিমান্ড শেষে দয়ালকে পাঠানো হয় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে। পায়ে ছিল গভীর ক্ষত, যা দিন দিন ফুলে উঠছিল। “আমার প্রিয় ‘ভাইজান’ গেটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। সেই অন্ধকারে সেটাই ছিল সাহসের শেষ আলোকরশ্মি,”- জানান তিনি।
৫ আগস্ট বিকেলে হঠাৎ করেই কারাগারের ভেতর থেকে ভেসে আসে চিৎকার- “হাসিনা পালিয়েছে!” কিছুক্ষণ পর কারা কর্তৃপক্ষের মাইক থেকে ঘোষণা আসে: “অবৈধ সরকারের পতন ঘটেছে”।
“তখন আমরা সবাই চিৎকার করে কাঁদছিলাম, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। জেলখানার দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। আমি, ইবরাহীম কার্দী ভাই, জেনিন- we hugged each other, cried and screamed together,” বলেন দয়াল।
তবে সেই মুক্তির মুহূর্তেও তার চোখে ভাসছিল বাবা-মায়ের মুখ।
“বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। দেড় যুগ ধরে মামলা, হামলা, পলায়ন- কেবলই ত্যাগ আর যন্ত্রণার ইতিহাস। মনে হচ্ছিল এবার তাঁদের সামনে গিয়েই দাঁড়াতে পারবো,”- বলেন তিনি।
৬ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পর দয়াল বলেন, “৩৬ জুলাই কেবল একটি তারিখ নয়- এটি এক রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞা, একটি প্রজন্মের আত্মত্যাগের প্রতীক। এই দিন যেন কখনো দুষ্কৃতিকারীদের হাতে কলঙ্কিত না হয়।”
তিনি শহীদদের স্বীকৃতি, আহতদের চিকিৎসা এবং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান।
“আমরা কেবল ৩৬ জুলাই উদযাপন করবো না- এই দিনের দায় নেব।
শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করবো উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের মাধ্যমে।”
