বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত প্রথম ভোটে বিজয়ী (First-Past-The-Post – FPTP) পদ্ধতিতে সাধারণত যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন, এমনকি তার প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা মোট ভোটের ৫০ শতাংশের নিচে হলেও। এই পদ্ধতির নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিরোধী অনুপাত নির্বাচন (Proportional Representation – PR) পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিআর ব্যবস্থা চালু হলে রাজনৈতিক দলগুলো যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা সংসদে আসন পাবে। এতে করে বৃহৎ দলের পাশাপাশি ছোট দলগুলোও উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব পাবে এবং সংসদ হবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
গণতন্ত্র গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থায় একটি দল মোট ভোটের তুলনায় অনেক বেশি আসন পেয়ে একক কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক। পিআর পদ্ধতি এই বৈষম্য কমাতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই ব্যবস্থায় সংখ্যালঘু, নারী এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ বাড়ার সুযোগ থাকে, যা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে শক্তিশালী করে।”
তবে পিআর ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, পিআর চালু হলে দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা সংকট দেখা দিতে পারে, কারণ তালিকাভিত্তিক প্রার্থী মনোনয়ন দলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এতে করে দলের প্রতি অনুগতদের প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে প্রকৃত জনপ্রিয় প্রার্থীর পরিবর্তে।
এছাড়া, এই ব্যবস্থায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় জোট সরকার গঠনের প্রয়োজন পড়বে, যা বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, “পিআর ব্যবস্থা চালু করতে হলে সংবিধান, নির্বাচন আইন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এটি কোনো রাতারাতি সিদ্ধান্ত নয়।”
এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ থেকে পিআর পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় এবং আলোচনার দাবি উঠেছে। অনেকেই বলছেন, একটি আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পিআর ব্যবস্থার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
অবশ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ বা প্রস্তাবনা আসেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে পিআর পদ্ধতি নিয়ে একটি জাতীয় পর্যায়ের সংলাপ শুরু করা যেতে পারে।
