সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকবিতণ্ডা থেকে কি পারমাণবিক উত্তেজনার সূত্রপাত হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের কিছু মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে জানিয়েছেন, তিনি দু’টি পারমাণবিক সাবমেরিন রাশিয়ার সন্নিকটে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
তবে, মস্কোর প্রতিক্রিয়া? একেবারে নীরব।
রাশিয়ার কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ- না ক্রেমলিন, না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এমনকি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত- এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
রাশিয়ার গণমাধ্যমে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে বেশ তাচ্ছিল্যভাবেই দেখা হচ্ছে। মস্কোভস্কি কোমসমোলেতস পত্রিকায় এক সামরিক বিশ্লেষক একে “বাচ্চাদের মতো রাগের বহিঃপ্রকাশ” বলে মন্তব্য করেছেন।
অবসরপ্রাপ্ত এক লেফটেন্যান্ট জেনারেল কমারসান্ত পত্রিকায় বলেন, “ট্রাম্পের এই সাবমেরিন পাঠানোর ঘোষণা অর্থহীন প্রলাপ। এটাই তার বিনোদনের ধরন।”
কমারসান্ত আরও উল্লেখ করে, ২০১৭ সালে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, তিনি উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করতে দু’টি পারমাণবিক সাবমেরিন কোরীয় উপদ্বীপের দিকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু পরে তিনিই কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
সেই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি এবারও ট্রাম্পের সাবমেরিন মোতায়েন কোনো উচ্চপর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া শীর্ষ বৈঠকের ইঙ্গিত?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেটি বলা সম্ভব না হলেও, রুশ কর্তৃপক্ষের নিরব প্রতিক্রিয়া কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এমনকি রুশ পারমাণবিক সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার কাছে মোতায়েনেরও কোনো খবর নেই। এটি হয়ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মস্কো বিষয়টি এখনো মূল্যায়ন করছে অথবা সরাসরি প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন মনে করছে না।
মূলত এই উত্তেজনার সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে ৫০ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে তা কমিয়ে দুই সপ্তাহে নিয়ে আসেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মেদভেদেভ বলেন, “রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের প্রতিটি নতুন আলটিমেটাম যুদ্ধের পথে একধাপ অগ্রগতি।”
জবাবে ট্রাম্প লেখেন, “মেদভেদেভ নামের ব্যর্থ সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি এখনো নিজেকে ক্ষমতায় ভাবেন, তিনি যেন তার কথা চিন্তা করে বলেন। তিনি বিপজ্জনক এলাকায় পা রাখছেন।”
এর জবাবে মেদভেদেভ সোভিয়েত আমলে তৈরি ‘ডেড হ্যান্ড’ নামক স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক প্রতিশোধ ব্যবস্থা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দেন। যা ট্রাম্পের চোখে পড়ে এবং রীতিমতো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
মেদভেদেভকে একসময় তুলনামূলক উদারপন্থী নেতা হিসেবেই বিবেচনা করা হতো।
২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তাঁর একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি ছিল, “স্বাধীনতা না থাকার চেয়ে স্বাধীনতা থাকা ভালো।”
কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে মেদভেদেভ সোশ্যাল মিডিয়ায় উগ্র, পশ্চিম-বিরোধী মন্তব্যের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছেন। যদিও তাঁকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র হিসেবে দেখা হয় না।
এবারই প্রথম তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি নজরে এসেছেন।
এবং শুধু নজরে নয়, ট্রাম্পকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ করে তুলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য অনেকেই এড়িয়ে চলেন। কিন্তু কেউ যদি এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে সরাসরি পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন করেন, তাহলে সেটিকে নিছক প্রতিক্রিয়া বলা যায় না।
তবে ট্রাম্প কেন এমন করলেন?
নিজের দেওয়া নিউজম্যাক্স সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “মেদভেদেভ এমন কিছু কথা বলেছে, যেখানে ‘পারমাণবিক’ শব্দটি ছিল। আমি যখন এই শব্দ শুনি, তখন সতর্ক হয়ে যাই। কারণ, এটিই সর্বোচ্চ হুমকি।”
বলা হচ্ছে, ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এরকম চমকপ্রদ পদক্ষেপ নিয়েছেন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করে তোলাই ট্রাম্পের পরিচিত ধরন— ব্যবসা কিংবা রাজনীতি, উভয়ক্ষেত্রেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি হয়ত ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর আলোচনার একটি চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে।
যাই হোক, পারমাণবিক যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে সামাজিক মাধ্যমে টকবাজি থেকে শুরু করে সাবমেরিন মোতায়েন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা তৈরি করছে।
সূত্র: BBC
